সবুজ তোতা খাঁচায়৷ খাঁচাটি সোনার নয়৷ বন্ধনটিও সম্মানের নয়৷ দাগি অপরাধীদের মতোই গ্রেফতার৷ কাঠের জালে পুলিশি গরাদের মধ্যে বারাসত কোর্টে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন হোসে রামিরেজ ব্যারেটো৷ দৃশ্যটা চমকপ্রদ সন্দেহ নেই৷ তবে একই সঙ্গে লজ্জারও৷ এই লজ্জা যত না ভারতীয় ফুটবল বা সম্পূর্ণ অসেচতন ক্লাব কর্তাদের, তার থেকে ঢের বেশি শুল্ক বিভাগের অতিসক্রিয়তার ও মান্ধাতা আমলের বস্তাপচা আইনের৷

আইন মতে কোনও বিদেশি ভারত থেকে দেশে ফেরার সময় সর্বাধিক ১০ হাজার মার্কিন ডলার নিয়ে যেতে পারেন৷ ব্যারেটোর সঙ্গে ছিল ২০ হাজার ৫০০ ডলার, সামান্য ১০ পাউন্ড, ৯ ব্রাজিলীয় রিয়েল ও ২২৮০ ভারতীয় টাকা৷ ব্যারেটোর রোজগারের সামান্য অংশ মাত্র৷ জেলে যাওয়ার মতো অপরাধ? অপরাধী বলবেন তাকে, যিনি শিশুর সারল্যে শুল্ক বিভাগের অফিসাদের প্রথম প্রশ্নেই যাবতীয় তথ্য দিয়ে দেন? কিন্তু পাবলিক ফিগার বধের আনন্দই আলাদা৷ তোতা কাহিনীর মোচড়টা দিতে শুল্ক বিভাগ যে তত্পরতা দেখান, আহা, তার সামান্য অংশও যদি দফতরকে দুর্নীতিমুক্ত বা আইনকানুনের সরলীকরণে দেখা যেত! আইনটি যবে হয়েছিল, তারপর গঙ্গা, বল্গা, মায় টেমস বেয়ে কত গ্যালন জলই তো বয়ে গেল, ভারতও বিশ্ব অর্থনীতির পথ ধরে উদারনীতির পথে পা বাড়াল, কিন্তু শুল্ক বিভাগের আইন থেকে গেল সেই মান্ধাতার জমানায়৷ আর তার ফল ভুগতে হল দুরন্ত পাস বা ড্রিবলের বাইরে সারাক্ষণ বাইবেলের পাতায় ডুবে থাকা ঈশ্বরভক্ত ব্যারেটোকে৷ ব্রাজিলে এই বদনাম হয়তো কিছুটা পৌঁছবে৷ স্ত্রী আর কন্যা হয়তো বিমানবন্দরে ব্যারেটোর প্রতীক্ষায় কয়েক ঘণ্টা কাটাবেন৷ কিন্তু তাতে কী? এমন ‘হাই প্রোফাইল অপরাধী’ ধরার কৃতিত্বে শুল্ক বিভাগের কর্তাদের নাম কতদিন পর শিরোনামে৷ সরকারি চাকরি করে নিখরচায় এমন বিজ্ঞাপনের লোভ সম্বরন করা যে কতটা কঠিন, তা বৃহস্পতিবার শুল্কবাবুদের দৌড়দৌড়িতে বেশ বোঝা যাচ্ছিল৷
ব্যারেটো আইন জানতেন না৷ ডলার লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া বা ডলার নেওয়ার খবর অস্বীকার করার কোনও চেষ্টাই করেননি৷ আইন না মানার যুক্তি যারা মানতে নারাজ, তাঁরা কি একবার ভাববেন যে, বিদেশি তো দূরঅস্ত, কজন ভারতীয় জানেন সর্বোচ্চ কত ডলার নিয়ে বিদেশে যাওয়া যায়! অনেকে বলছেন, ব্যারেটোকে কর্মকর্তাদের আইনটা জানানো উচিত্ ছিল৷ ঠিকই তো, কিন্তু তার পাশাপাশি আইনটাকে আধুনিক সময় ও অর্থনীতির উপযোগী-ই বা করার চেষ্টা করা হবে না কেন?
তবে এহেন তোতা কাহিনীর একটা ভাল দিকও দেখা গেল৷ প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিভেদ, কাদা ছোড়াছুড়ি ভুলে এই একটি বিষয়ে অন্তত গোটা ময়দান এককাট্টা৷ সত্, নির্বিবাদী, ধর্মপ্রাণ, ব্যারেটোর পাশে সবুজ-মেরুণ থেকে লাল-হলুদ— শুধু যে সব দলের সতীর্থরাই এসে দাঁড়িয়েছে তা নয়, ফুটবলপ্রেমী বাঙালির অকুন্ঠ আবেগও তার সঙ্গে আছে৷ কাজেই এ হেনস্তা, ময়দান কাঁপানো সবুজ তোতার ফুটবল কেরিয়ারে যবনিকা পাত তো দূরঅস্ত, ছেদও ঘটাতে পারবে না৷
তোতা কাহিনী অন্তত এখানে শেষ হচ্ছে না৷ আর তার শেষ অধ্যায়ও শুল্ক কর্তারা লিখবেন না৷ লিখবে ব্যারেটোর প্রতিভা৷ তার পায়ের যাদু৷