১৮ এপ্রিল, শুক্রবার ভারতীয় সময় পৌনে দশটা নাগাদ ১৯৮৮ সালে জন্মানো ইশান্ত শর্মার ইনস্যুইং ইয়র্কার যখন দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান, দশহাজারি রাহুল দ্রাবিড়ের উইকেট ছিটকে দিল, লম্বা হাঁফ ছেড়ে তখন নিশ্চই ক্রিকেটের ‘বিশুদ্ধবাদীরা’ ভাবলেন, যাক ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে টাকার প্রাচুর্য এবং চলচ্চিত্র তারকাদের নাচগান অন্তত দিল্লির এই পেস বোলারের কোনও ক্ষতি করতে পারেনি৷ এমনকী আমার মতো প্রথম দর্শনেই টুয়েন্টি-টুয়েন্টির প্রেমে পড়ে যাওয়া লোক থেকে শুরু করে ‘টেস্ট ক্রিকেটই একমাত্র ক্রিকেট’ বিশ্বাস করনেওয়ালারা মনে করতেই পারেন, আইপিএলে সবচেয়ে দামি পেসার ইশান্তের ভান্ডারে যা যা অস্ত্র মাত্র কিছুদিন আগেই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে রোমহর্ষক টেস্ট সিরিজে দেখা গিয়েছিল, তাতে মরচে তো পড়েইনি, বরং নয়া ক্রিকেট ফর্ম্যাটে ইশান্তের বোলিং দেখে তো মনে হল, অন্য যে কোনও ক্ষেত্রের পেশাদারের মতোই বাড়তি টাকাটা তাঁর কাছে বাড়তি মোটিভেশন৷
ঠিক যতগুলো কারণে কিছু কিছু মানুষ এই আইপিএল-কে কালো তালিকাভূক্ত করতে উঠে পড়ে লেগেছেন, তার মধ্যে একটি হচ্ছে, প্রচুর টাকা উড়ছে এখানে৷ মাইকেল শুমাখার, রজার ফেডেরার, রোনাল্ডিনহো থেকে বিল গেটসের উপার্জন দেখেই তো আমরা আলোচনা করি ‘কী ভাল’ ‘কী ভাল’ বলে, আর রাঁচির মতো ছোট্ট শহরের ধোনি বেশি রোজগার করলেই ‘হায় কপাল, ক্রিকেটটা উচ্ছন্নে গেল’! টাকা যেন রোজগার করার জন্য নয়, স্রেফ ডাকাতি করার জন্য৷ অদ্ভুত ব্যাপার, জিদানের দাম দেখে তো কোনও দিন কাউকে বলতে শুনিনি রিয়াল মাদ্রিদে ফুটবলটা উচ্ছন্নে গেছে৷
আসলে নতুন কিছুকেই প্রথমে মানতে না পারা মানুষের একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি৷ অথচ ইতিহাসের কী নির্মম প্রতিশোধ দেখুন, আইপিএলের প্রথম ম্যাচে সদ্য কুড়ির কোঠায় পা দেওয়া প্রবীন কুমার প্রথম ওভার বল করছেন মধ্য তিরিশের সৌরভকে, আর কমেন্ট্রি বক্সে সুনীল গাভাসকার৷ গাভাসকারও মানতে পারেননি একসময় ওয়ান-ডে ক্রিকেটকে৷ আর মানতে পারেননি বলেই তো টেস্টের প্রথম দশহাজারি ওয়ান-ডে’তে ৬০ ওভারে ৩৬ রান করেছিলেন৷ আজ কি আইপিএলের এই ২০ ওভারের ক্রিকেট প্রথম ম্যাচে প্রথম কমেন্ট্রি বক্সে বসে তারই প্রায়শ্চিত্ত করলেন তিনি? তবে সবাই তো আর গাভাসকার নন, গাভাসকারের থেকেও টেস্ট ক্রিকেটের মর্ম বেশি বোঝেন এমন বহু মানুষই কলকাতা-সহ গোটা রাজ্যের বহু চায়ের দোকানে এবং বিভিন্ন অফিস ক্যান্টিনে আড্ডা মারেন৷ তাঁরা কিন্তু এখনও অন্তত আলোচনা সভায় আইপিএলের বিরুদ্ধে৷ তবে একটাই সান্তনা, তাঁরা ম্যাচগুলি দেখছেন৷ একসময় যেমন ওয়ান-ডে’র বিরুদ্ধাচার করেছিলেন এবং তা দেখেওছিলেন৷ তবে এখন আর তারা ওয়ান-ডে’টাও দেখছেন না, তাই তো লোলিত মোদিদের মাথা ঘামিয়ে বের করতে হচ্ছে ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করার নানা কৌশল৷ ‘বিশুদ্ধবাদীরা’ ভেবে দেখুন, টেস্টের জনপ্রিয়তা গিয়েছে অনেকদিন আগেই, এখন আর সারাদিন ধরে ১০০ ওভারের ম্যাচ দেখার সময় নেই অনেকেরই৷ তাই তো মোটামুটি একটা বড় হিন্দি সিনেমার সময়ে নামিয়ে আনতে হয়েছে ক্রিকেটকে৷ কয়েক বছর পর একটু ছোট ইংরেজি সিনেমার সময়ে ক্রিকেট নেমে এলেও আশ্চর্য হবেন না প্লিজ, কারণ, ১৯৬০ সালে একটি ২০ বছরের যুবকের হাতে যা সময় ছিল, আজ ১২ বছরের একটি বাচ্চার হাতেও সেই সময় নেই৷
আর ক্রিকেটটা রসাতলে গেল বলে আইপিএল থেকে চোখ সরিয়ে রাখার মতো ভুল করবেন না, তাহলে মিস করবেন প্রথম ম্যাচেই ব্রেন্ডন ম্যাককুলামের ভয়াবহ সুন্দর ইনিংস৷ এমন অত্যাশ্চর্য ইনিংস কিন্তু মাঝেমধ্যেই ঘটবে৷ আর এই আইপিএল দেখার আগে একবার দেখে নিই চলুন কমপ্যাক্ট অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশেনারি ‘ক্রিকেট’ শব্দের মানে কী বলছে৷ এই ডিকশেনারির ২৩২ পৃষ্ঠায় ক্রিকেট শব্দের মানে, ‘an open air game played by two teams of eleven players with a ball, bats and wickets, the batsmen attempting to score runs by hitting the ball and running between the wickets.’
অক্সফোর্ডের মতে, রান করাটাই ক্রিকেটে মুখ্য৷ আইপিএলে রানটাই তো একটু তাড়াতাড়ি হচ্ছে৷ ক্ষতি কী?