ভোটাররা চোখে ভাল দেখতে পান না৷ কারও-বা হাত কাঁপে থরথরিয়ে৷ এই অজুহাতে প্রার্থী নিজেই ভোটারদের হয়ে ‘কেস্তে-হাতুড়ি’ চিহ্নে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করছেন৷ চোখের সামনে সব কিছু ঘটলেও প্রিসাইডিং অফিসারের ভূমিকা নীরব দর্শকতুল্য৷ তুলনায় সিপিএমের কেন্দুয়া লোকাল কমিটির সদস্য শেখ সাজাহান অনেক বেশি সক্রিয়৷ বুথের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে গোটা বিষয়টি তত্ত্বাবধান করছেন৷ ধারে-কাছে কোনও বিরোধী দলের এজেন্ট নেই৷ অতএব, প্রতিবাদও নেই৷ ঘটনাস্থল সিউড়ির কেন্দুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের দিশালপুরের ২ বাই ২ নম্বর বুথ৷ আর ওই পরোপকারী প্রার্থীর নাম সাবিনা পারভিন৷ (চলনে-বলনে বেশ স্মার্ট৷ কেন অন্যের হয়ে ভোট দিচ্ছেন, দিব্যি সে-ব্যাখ্যা দিলেন৷) রবিবার ‘স্টার আনন্দ’-এর পর্দায় নিরঙ্কুশ নির্বাচনের এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে আক্ষরিক অর্থেই মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যান৷
এ-ও কি সম্ভব? প্রার্থী নিজের হাতে অন্যের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন? বিষয়টি যে আদপেই গণতান্ত্রিক নয়, তা বোঝার জন্য আইনের জটিল নিয়ম-কানুন জানার দরকার নেই৷ রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সচিব সুধীন্দ্রনাথ রায়চৌধুরীর বক্তব্যও প্রমাণ করে ঘটনাটি রীতিমতো বেআইনি৷ তিনি বলেছেন, কোনও প্রার্থী নিজে হাতে অন্যের ভোট দিয়ে থাকলে, নির্বাচন বিধি অনুযায়ী সেটি গুরুতর অন্যায় বলেই বিবেচিত হবে৷ অভিযুক্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে এফআইআর হওয়া উচিত৷ প্রয়োজনে, সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসারের বিরুদ্ধেও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনা হতে পারে৷ আর সব কিছু জেনে-শুনে বীরভূমের সিপিএম জেলা সম্পাদক দিলীপ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া, হ্যাঁ, বেনিয়ম একটা হয়েছে৷ প্রশাসন ওই বুথে পুনর্নির্বাচনের আদেশ দিলে, আপত্তি নেই৷ তবে প্রার্থী সাবিনা পারভিনের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে-বিষয়ে রা কাড়েননি তিনি৷
এটাই হয়তো স্বাভাবিক৷ সংসদীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতা দখল করা যত না কঠিন, দখলীকৃত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা ঢের শক্ত কাজ৷ সিপিএমের মতো রেজিমেন্টেড দলের কর্মীরা এ কথা দিব্যি বোঝেন৷ এবং বোঝেন বলেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এত নির্বিকারে পরোপকার করতে তাঁদের বাধে না৷ তবু বলতে হয়, এ সবই ঘটনার বহিঃত্বক৷ বিবরণমাত্র৷ কেঠো তথ্য অতিক্রম করে ঘটনার ভিতরে প্রবেশ করলে হাড় হিম হয়ে আসে৷
এ বছর ১৭টি জেলা পরিষদে পঞ্চায়েত ভোট হয়েছে ৩ দফায়৷ সংবাদ মাধ্যম যতই তত্পর থাকুক, রাজ্যের প্রতিটি বুথ বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে তারা পৌঁছতে পারেনি৷ আর এখানেই আশঙ্কা, আতঙ্ক৷ দেশালপুরে সাবিনা পারভিনরা যে-কাণ্ড ঘটিয়েছেন, রাজ্যের অন্য কোথাও তেমন ঘটনা ঘটেনি এ কথা কি জোর দিয়ে বলা যায়? আর মিডিয়া পৌঁছতে না পারলে সে সব কথা জানা যাবেই বা কী করে?
দ্বিতীয় আশঙ্কাটির কথা জানিয়েছেন অর্থনীতির বিশিষ্ট অধ্যাপক অভিরূপ সরকার৷ ‘স্টার আনন্দ’-র স্টুডিওতে বসে তাঁর মূল্যায়ণ, ভোটারদের শারীরিক অসুবিধের কথা বিবেচনা করে আজ সাবিনা পারভিন নিজেই ভোটারদের হয়ে ভোট দিচ্ছেন৷ কাল হয়তো বৃহত্তর সুবিধের কথা ভেবে ভোটারদের বুথে আসতেই মানা করবেন৷ বলবেন, আপনাদের হয়ে আমিই ভোট দিয়ে দেব৷ অভিরূপবাবুর বিশ্লেষণে ব্যঙ্গের ছোঁয়া আছে৷ কিন্তু সিপিএম কর্মীদের দুর্মর স্বভাবের কথা বিবেচনা করলে, এ ঘটনার সম্ভাব্যতা উড়িয়ে দেওয়া যায় না৷ তা ছাড়া, সিপিএম কর্মীরা নিজেরাই বলেন, এ রাজ্যে সিপিএমের বিকল্প নাকি আরও উন্নততর সিপিএম৷ সেহেতু ভবিষ্যতে ‘উন্নততর’ সিপিএমের প্রার্থীরা আরও ‘উন্নততর’ পরোপকারের নমুনা পেশ করলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না৷